-মো.কমাল উদ্দিনঃ
ভিড়ভাট্টার শহরে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ছুটে চলে, কেউ কাজের খোঁজে, কেউ বা জীবিকার তাগিদে। সেই ব্যস্ততার মাঝেই নিরবে বসে থাকেন পেয়ারি বেগম—ভাংতি টাকার ব্যবসা নিয়েই তার সকাল শুরু হয়। প্রথম দেখায় সাধারণ মনে হলেও, তার হাসি আর সংগ্রামী চোখের দৃষ্টিতে লুকিয়ে আছে জীবনের গভীর গল্প। লালখান বাজার মোড়ে বসে আছেন ভাংতি টাকার ব্যবসায়ী পেয়ারি বেগম। ক্লান্ত অথচ মুখে সরল হাসি। পরনে সাদামাটা ফুলেল নকশার কমলা রঙের কাপড়, কাঁধে ঝোলানো পুরোনো এক ধরনের ব্যাগ—যেখানে প্রতিদিনের ভাংতি টাকার হিসাব গুছিয়ে রাখেন তিনি। হাতে সাজানো নোট আর কয়েন, যেনো ব্যস্ত নগরীর হাজারো মানুষের দরকারি সঙ্গী। গাড়ির শব্দ, মানুষের ভিড় আর রিকশার কোলাহলের মাঝেই তিনি শান্তভাবে বসে আছেন নিজের কাজের অপেক্ষায়। কারো কাছে মনে হতে পারে সাধারণ এক নারী, কিন্তু আসলে তিনি শহরের প্রতিদিনের লেনদেনকে সহজ করে তোলেন—একটি অদৃশ্য প্রয়োজন মেটান নীরবে। চোখেমুখে জীবনের কঠিন সংগ্রামের রেখা, তবু ভেতরে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা—যা তাকে প্রতিদিন নতুন করে দাঁড়াতে শিখিয়েছে এই ব্যস্ত শহরের মোড়ে। শহরের ভিড়ভাট্টা, রোদ-বৃষ্টি, ধুলো-ধোঁয়ার মাঝেও প্রতিদিন সকালবেলা যখন আমি বাটালি পাহাড়ের শতায়ু অঙ্গনের বন্ধুদের সাথে
হাঁটতে বের হই, তখন লালখান বাজার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারীর দিকে আমার দৃষ্টি বারবার গিয়ে পড়ে। সাধারণ শাড়ি গায়ে, বিনয়ী মুখশ্রী, নিরাভরণ সাজসজ্জা—প্রথম দর্শনে তাকে সহজেই যে কেউ ভিক্ষুক বলে ভুল করতে পারে। আমিও প্রথমে তাই ভেবেছিলাম। মনে হয়েছিল, হয়তো এই নারীও প্রতিদিন গাড়ির যাত্রীদের কাছে হাত পেতে কিছু টাকা চান। কিন্তু কৌতূহলী আমি একদিন তার সামনে গিয়ে পরিচয় দিলাম, কথা শুরু করলাম। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হলো এক অজানা সত্য—তিনি ভিক্ষুক নন, তিনি ব্যবসায়ী। তার নাম পেয়ারি বেগম।পেয়ারির জীবনচিত্র একেবারেই আলাদা। তিনি যৌবনকাল থেকেই ভাংতি টাকার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তিরিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতিদিনের সকাল কাটাচ্ছেন তিনি। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে হাতে ছোট ছোট নোটের গুচ্ছ নিয়ে লালখান বাজার মোড়ে তার অবস্থান। বাস, টেম্পু, সিটি সার্ভিস—এসব গাড়ির চালক-হেলপারদের কাছে তিনি ভাংতি টাকা বিক্রি করেন। আমরা যারা প্রতিদিন যাতায়াত করি, প্রায়ই দেখি চালক-যাত্রীর মধ্যে বাকবিতণ্ডা হচ্ছে ভাংতি টাকা না থাকার কারণে। ভাড়া নেওয়া বা ফেরত দেওয়ার সময় টাকার খুচরা মেলে না। এই জটিলতা থেকে মুক্তি দেয় পেয়ারির মতো মানুষরা। একশো টাকার নোট দিয়ে চালক ভাংতি নিলে সেখানে বিশ টাকা কম থাকে। অর্থাৎ শতে কুড়ি টাকা লাভ করেন পেয়ারি। এটাই তার ব্যবসা, এটাই তার উপার্জনের পথ। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত তিনি এই কাজ চালান। পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয় তার। দুপুরে বাসায় ফিরে খাওয়া-দাওয়া সেরে আবার বিকেলে বের হন অন্য এক কাজে—ভাংতি টাকা সংগ্রহ করতে। শহরের বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁয় গিয়ে তিনি ভাংতি টাকা সংগ্রহ করেন। এসব হোটেলে প্রচুর খুচরা টাকা জমা হয়, কিন্তু তারা সেই টাকা বাজারে চালাতে পারে না। তাই তারা নোটের বিনিময়ে ভাংতি দিয়ে দেয় পেয়ারির মতো ব্যবসায়ীদের হাতে। আবার অনেক সময় বাসার মাটির ব্যাংক ভেঙে পাওয়া যায় ঝকঝকে ভাংতি টাকা। সেসবও কম দামে কিনে নেন পেয়ারি। যেমন—শত টাকার বিপরীতে আশি টাকা দিয়ে কেনা। সেখানেই তার বাড়তি লাভ।
নতুন টাকার ব্যবসা আমরা সবাই জানি—বিশেষ করে ঈদের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে ভিড় জমে। কিন্তু ভাংতি টাকার ব্যবসা? সেটা আমাদের অচেনা। অথচ শত শত নারী-পুরুষ এই পেশায় নিয়োজিত। শহরের মোড়েগলিতে দাঁড়িয়ে তারা চালকদের ভাংতি সরবরাহ করে। একজন যায় সকালে, আরেকজন থাকে বিকেলে। এভাবেই চলে এই চক্র। পেয়ারির নির্দিষ্ট জায়গা হলো লালখান বাজার মোড়। বৃষ্টি হোক, ঝড় হোক—তিনি নিয়মিত থাকেন সেখানে। গাড়ির চালকরা তাকে চিনে ফেলেছেন। গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গেই ইশারায় ডাকেন, আর তিনি ছুটে যান ভাংতি নিয়ে।
আমি যখন প্রথম দেখেছিলাম তাকে, তখন তাকে ভিক্ষুক ভেবেছিলাম। কিন্তু তার গল্প শুনে মনে হলো, এই শহরের অজানা শ্রমজীবী নারীদের মধ্যে পেয়ারি এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সৎ পরিশ্রমে জীবন গড়েছেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেছেন। ছেলে-মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, সংসার চালিয়েছেন, অথচ পেশা বদলাননি। আজও ভাংতি টাকার ব্যবসার মধ্য দিয়েই তার দিন চলে।
আমরা সমাজে অনেক সময় ভুল চোখে দেখি এমন মানুষদের। অথচ পেয়ারি বেগম প্রমাণ করেছেন, সম্মান ভিক্ষায় নয়—সৎ পরিশ্রমে। যে কাজ ছোট মনে হয়, সেই কাজ দিয়েই তৈরি হয় জীবনের বড় অধ্যায়। পেয়ারি আজ আর ভিক্ষুক নন, তিনি ব্যবসায়ী—ভাংতি টাকার ব্যবসায়ী। তার হাতে গড়া প্রতিটি পয়সার পোটলিতে আছে ঘামের গন্ধ, পরিশ্রমের গল্প, জীবনের ত্যাগ।
আমি পেয়ারি বেগমের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। তার মতো মানুষের সৎ সংগ্রাম আমাদের শেখায়—কোনো কাজ ছোট নয়, শুধু ইচ্ছাশক্তি বড়।