মো.কামাল উদ্দিনঃ
জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছাত্রসমাজের ভূমিকা ছিল অনন্য ও ঐতিহাসিক। একাংশ ছাত্রদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সংগঠন আপ-বাংলাদেশ সেই সময় জাতীয় রাজনীতিতে নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছিল। বিশেষ করে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে যখন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও জনগণের অধিকার রক্ষার প্রশ্নটি সামনে আসে, তখন ছাত্র সমাজই তার অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। ৬ই সেপ্টেম্বর শুক্রবার
সন্ধ্যা ৭টায় চট্টগ্রাম মহানগর আপ-বাংলাদেশ কমিটির আয়োজনে জুবিলী রোডস্থ মেট্রোপোল কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই সুধী সমাবেশে বিশেষ বক্তা হিসেবে উপস্থিত হয়ে আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই— ছাত্রসমাজ বরাবরই আমাদের জাতীয় সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক নানা গণআন্দোলন— প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছাত্রদের আত্মত্যাগ ও সাহসিকতা আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে। জুলাই আন্দোলন সেই ধারাবাহিক সংগ্রামের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। এ আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও শোষণমুক্ত সমাজের জন্য ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম ছাড়া বিকল্প নেই। ছাত্ররা তাদের সাহস, সততা ও আদর্শ দিয়ে প্রমাণ করেছে— কোনো দমননীতি বা স্বৈরাচার কখনোই জাতির মুক্তির পথকে রুদ্ধ করতে পারে না। চট্টগ্রাম মহানগরের আয়োজিত এক বুদ্ধিদীপ্ত সভায় আজ আমি যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছিমূলত বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণার অভিজ্ঞতার ফল। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নয়; বরং একান্তভাবে নির্বাচনী কাঠামোর ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং তার পরিত্রাণের পথ নিয়ে চিন্তাশীল বিশ্লেষণ। আমি ২০১০ সালে প্রকাশিত আমার গবেষণাগ্রন্থ “বাংলাদেশের নির্বাচন ও নির্বাচনি তথ্য উপাত্ত”-এর আলোকে এই আলোচনা করেছি। নির্বাচনের খুঁটিনাটি তথ্য, ভোটের হিসাব এবং জনগণের অংশগ্রহণের চিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমি যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি, সেটি আজও অটল—গণতন্ত্রের প্রকৃত রূপ প্রতিষ্ঠার জন্য পিআর বা প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন পদ্ধতি ছাড়া বিকল্প নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠতার সংকট-আমাদের বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থা হলো “ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট”। এই ব্যবস্থায় যে প্রার্থী সর্বাধিক ভোট পান, তিনি নির্বাচিত হন—যদিও তার ভোট মোট প্রদত্ত ভোটের অর্ধেকেরও কম হতে পারে। ফলে, একটি আসনে হয়তো চল্লিশ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রার্থী জয়ী হন, অথচ ষাট শতাংশ ভোট অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীর পক্ষে যায়। সেই ষাট শতাংশ মানুষের ভোট কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। এভাবে প্রতিটি নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক ভোট মূল্যহীন হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে এই ব্যবস্থা চলতে থাকায় ভোটারদের মধ্যে হতাশা, অবিশ্বাস এবং অনাগ্রহ জন্ম নিচ্ছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, আমার ভোটের যদি প্রকৃত কোনো মূল্য না থাকে, তবে কেন আমি ভোট দিতে যাব? রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠা ও দর্শন রাজনৈতিক দল কখনো শূন্য থেকে জন্ম নেয় না। দল গড়ে ওঠে একটি দর্শন, একটি আদর্শ এবং জনগণের চাহিদাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু একটি দলের বিকাশ এবং প্রতিষ্ঠা নির্ভর করে গণতান্ত্রিক চর্চার ওপর। সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা কেবলমাত্র সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমেই সম্ভব। যদি নির্বাচনে প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব না থাকে, তবে দল তার দর্শন নিয়ে টিকতে পারে না; অল্প কিছু মানুষের প্রভাব বিস্তার ঘটে, আর বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বঞ্চিত থাকে। ফলে দলগুলি তাদের দর্শনকে জনগণের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করার পরিবর্তে কৌশলগত ক্ষমতা দখলেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। পিআর পদ্ধতির তাৎপর্য-পিআর বা প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন ব্যবস্থায় প্রত্যেকটি ভোটের মূল্য সমান থাকে। কোনো দল যদি জাতীয়ভাবে মোট ভোটের বিশ শতাংশ পায়, তবে সংসদেও তারা মোট আসনের বিশ শতাংশ পাওয়ার যোগ্য হয়। এভাবে ছোট দল, নতুন দল কিংবা বিকল্প রাজনৈতিক মতও সংসদে প্রবেশাধিকার পায়। এতে করে সংসদ হয়ে ওঠে দেশের বহুমাত্রিক মতামতের প্রতিচ্ছবি। এই পদ্ধতি চালু হলে—১. ভোটাররা আস্থাশীল হবে: কারণ তারা জানবে, তাদের ভোট কখনোই নষ্ট হবে না। ২. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে: এককভাবে কোনো দল ক্ষমতা দখল করতে না পারলেও জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে, যা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করবে।৩. জনগণের বহুমুখী মত প্রতিফলিত হবে: সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা ও মতাদর্শ সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পাবে।৪. ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা হবে: সংখ্যাগরিষ্ঠতার নামে একক আধিপত্য স্থাপন করা কঠিন হবে। অতীত অভিজ্ঞতা ও গবেষণার আলোকে-আমার গবেষণায় দেখা গেছে, বিগত নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক ভোট অব্যবহৃত থেকে গেছে। বহু প্রার্থী মোট ভোটের অর্ধেকেরও কম নিয়ে সংসদে প্রবেশ করেছেন। ফলে জনগণের প্রকৃত ইচ্ছা সংসদে প্রতিফলিত হয়নি। আমার ২০১০ সালের বইয়ে বিস্তারিত পরিসংখ্যান তুলে ধরেছিলাম—কীভাবে ভোটের বিশাল অংশ “অকার্যকর” হয়ে গেছে এবং কীভাবে এই প্রক্রিয়া জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক বিমুখতা তৈরি করেছে। একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। কোনো আসনে ১ লাখ ভোটার ভোট দিলেন। তার মধ্যে প্রার্থী ‘ক’ পেলেন ৪০ হাজার, প্রার্থী ‘খ’ পেলেন ৩৫ হাজার, আর প্রার্থী ‘গ’ পেলেন ২৫ হাজার ভোট। এই ব্যবস্থায় প্রার্থী ‘ক’ নির্বাচিত হবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, ৬০ হাজার ভোটার তার বিপক্ষে ছিলেন। তাহলে কি বলা যায় তিনি প্রকৃত অর্থে জনগণের প্রতিনিধি? পিআর পদ্ধতি থাকলে প্রতিটি ভোট গণনা করে আসন বণ্টন হতো, এবং সব পক্ষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হতো।গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশের জন্য অপরিহার্য-একটি দেশের গণতন্ত্র তখনই সুস্থভাবে বিকশিত হয়, যখন জনগণের আস্থা অটুট থাকে। আস্থা হারিয়ে গেলে জনগণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে সরে যায়, আর সেই শূন্যস্থানে জন্ম নেয় চক্রান্ত, অস্থিরতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার। তাই নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায়ভিত্তিক করা সময়ের দাবি।
এজন্য পিআর পদ্ধতি চালু করা কেবল একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; এটি হবে জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার এক অনন্য পদক্ষেপ। এতে গণতন্ত্র আরও দৃঢ় হবে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি আরও সুস্থ হবে, এবং জনগণের অংশগ্রহণ বাড়বে বহুগুণে।আজকের সভায় আমি যে বক্তব্য দিয়েছি, তার সারকথা হলো—রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হয় দর্শনের ওপর, কিন্তু সেই দর্শনকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে গণতান্ত্রিক ভিত্তি অপরিহার্য। আর সেই গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে দৃঢ় করতে হলে পিআর পদ্ধতির বিকল্প নেই। বাংলাদেশ যদি একটি টেকসই, ন্যায়ভিত্তিক ও আস্থাশীল গণতন্ত্র গড়ে তুলতে চায়, তবে আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতেই হবে।ভোট হলো জনগণের কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠস্বর যেন কেউ উপেক্ষা করতে না পারে—এটাই গণতন্ত্রের সত্যিকার বিজয়। আর সেই বিজয়কে সম্ভব করার জন্য প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন পদ্ধতিই একমাত্র পথ।