
মো. কামাল উদ্দিনঃ
এক বছর আগের কথা। আমি কলম হাতে বসেছিলাম একরাশ অভিমান নিয়ে। দুইজন মেধাবী পুলিশ অফিসারের প্রতি রাষ্ট্রের অন্যায়ের কথা লিখতে গিয়ে বুকের ভেতর কেমন একটা লজ্জা ও ক্ষোভ একসাথে অনুভব করেছিলাম। তাঁদের নাম—হাসিব আজিজ ও আহসান হাবিব পলাশ। একই ব্যাচে (১৫তম বিসিএস) একসাথে পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করেছিলেন তাঁরা। দু’জনেই ছিলেন নিষ্ঠাবান, কর্মঠ ও অনমনীয় চরিত্রের অফিসার। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের চাপে বছরের পর বছর তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন ন্যায্য পদোন্নতি থেকে। দেখেছি, তাঁদের জুনিয়ররা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় রাজামহারাজা হয়ে উঠেছেন, অথচ এ দুইজন প্রকৃত পুলিশ অফিসারকে প্রান্তিক করে রাখা হয়েছে। আজ এক বছর পর আবার লিখতে বসেছি—কিন্তু এবার কলমে সেই ক্ষোভ নেই, বরং আছে শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা আর গর্বের অনুভব। কারণ, গত এক বছরে তাঁরা প্রমাণ করেছেন, সততা ও নিষ্ঠা কোনোদিন ব্যর্থ হয় না। আজ তাঁরা দুজনই অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। তবু তাঁরা তাঁদের আগের দায়িত্ব থেকে সরে যাননি; চট্টগ্রামে দাঁড়িয়ে মানুষের নিরাপত্তা, আস্থা ও মর্যাদা রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
চট্টগ্রামের আকাশে পরিবর্তনের হাওয়া
চট্টগ্রাম এক অন্যরকম শহর। সমুদ্রের গর্জন, পাহাড়ের সবুজ, বন্দরনগরের কর্মচাঞ্চল্য আর রাজনীতির উত্তাপ—সবকিছুর মিলনে চট্টগ্রাম সবসময়ই ছিল এক অগ্নিপরীক্ষার মঞ্চ। এই নগরে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ মানে কেবল অপরাধ দমন নয়, বরং মানুষের হৃদয় জয় করা। গত এক বছরে আমরা দেখেছি, হাসিব আজিজ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে কেবল পুলিশ প্রশাসন চালাননি, বরং পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে এনেছেন। চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, মাদক—যে অন্ধকার শক্তিগুলো এই শহরকে জর্জরিত করে তুলেছিল, তার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও আপসহীন। আরেকদিকে আহসান হাবিব পলাশ, যিনি দীর্ঘদিন পদোন্নতি বঞ্চনার যন্ত্রণা বুকে বয়ে চলেছেন, নিঃশব্দে কাজ করে গেছেন। তিনি যেন প্রমাণ করেছেন—যে মানুষ দায়িত্বের প্রতি সৎ, সে নিজের প্রাপ্য মর্যাদা একদিন না একদিন পাবেই। তাঁর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম রেঞ্জে যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা আজ দেশের জন্য এক দৃষ্টান্ত। বৈষম্য থেকে মর্যাদা: সময়ের প্রত্যাশিত প্রতিফলন-আজ তাঁরা অতিরিক্ত আইজিপি। এই পদোন্নতি কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং রাষ্ট্রের জন্য এক শিক্ষা। রাষ্ট্র যেন বুঝেছে—পদোন্নতির রাজনীতিতে, আঞ্চলিকতার গণ্ডিতে কিংবা দলীয় আনুগত্যের কৃত্রিম প্রাচীরে মেধা ও সততাকে চিরদিন আটকে রাখা যায় না। চট্টগ্রামের মানুষ আজ গর্বিত। কারণ, তাঁরা পেয়েছেন দুইজন অফিসার—যাঁরা কেবল পদমর্যাদায় বড় নন, বরং নীতি, নৈতিকতা ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতায়ও বড়। হাসিব আজিজ: সততার উত্তরাধিকার- হাসিব আজিজের নাম উচ্চারণ করলেই ভেসে ওঠে সততার প্রতীক এক পুলিশ অফিসারের ছবি। তিনি প্রখ্যাত আইজিপি এম আজিজুল হকের সুযোগ্য সন্তান। বাবার মতোই তিনি দায়িত্বে ছিলেন দৃঢ়, নীতিতে ছিলেন অটল। এক বছরের কমিশনার হিসেবে তাঁর ভূমিকা দেখিয়ে দিয়েছে—সততা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং নেতৃত্বের আসল শক্তি। আহসান হাবিব পলাশ: নীরব যোদ্ধার সাফল্য-অন্যদিকে, পলাশ সাহেবের নাম উচ্চারণ করলেই মনে হয় এক নীরব অথচ দৃঢ় ব্যক্তিত্বের কথা। তিনি আলো-ঝলমলের সংবাদে আসেননি, কিন্তু কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন—পুলিশ কেবল আইন প্রয়োগকারী বাহিনী নয়; বরং জনতার ভরসা। জনতার পুলিশ: নতুন দিগন্তের সূচনা- আজ চট্টগ্রামে আইন-শৃঙ্খলার দৃশ্যপট অনেকটাই বদলেছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরেছে, মাদক নিয়ন্ত্রণে এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন, সাধারণ মানুষ পুলিশের কাছে গিয়ে আস্থা নিয়ে কথা বলতে পারছে। এটাই আসল অর্জন—জনগণের ভরসা ফিরিয়ে আনা। এক বছর আগে লিখেছিলাম ক্ষোভের জায়গা থেকে। আজ লিখছি শ্রদ্ধার জায়গা থেকে। হাসিব আজিজ ও আহসান হাবিব পলাশ প্রমাণ করেছেন—যত বৈষম্যই হোক, সত্যিকার যোগ্য মানুষকে অবশেষে মর্যাদা দিতেই হয়। তাঁরা কেবল পুলিশ বাহিনীর দুইজন কর্মকর্তা নন, তাঁরা আজ এক প্রতীক—সততা, ন্যায্যতা ও সাহসিকতার প্রতীক। চট্টগ্রামের মানুষ তাঁদের প্রতি আস্থা রেখেছে। আমরাও বিশ্বাস করি, তাঁদের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম শহর আরও নিরাপদ হবে, পুলিশ হবে জনগণের প্রকৃত বন্ধু, আর বাংলাদেশ পুলিশ আবারও ফিরে পাবে তার গৌরবময় অবস্থান।
লেখকঃ সাংবাদিক, গবেষক, টেলিভিশন উপস্থাপক ও সভাপতি, জাতীয় সাংবাদিক মঞ্চ, চট্টগ্রাম।