-মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রাম মহানগরীর চান্দগাঁও থানায় সম্প্রতি একটি কাঠবাহী ট্রাক আটককে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে ও কয়েকটি অনলাইন পোর্টালে যে ঘুষের অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা বাস্তবতা বিবর্জিত ও উদ্দেশ্যমূলক বলে জানা গেছে। বিষয়টি সরেজমিনে অনুসন্ধান করতে গিয়ে পাওয়া গেলো সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র—যেখানে পুলিশের দায়িত্বশীল ভূমিকাই স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
ঘটনার শুরু: ২০২৫ সালের ২০ জুলাই রাত আনুমানিক ২টা ৫০ মিনিটে চান্দগাঁও থানার এএসআই (নিঃ) আবু জাফর বেপারী, সঙ্গীয় ফোর্সসহ রাষ্ট্রীয় লিস্টভুক্ত ডিউটি পালনকালে বহদ্দারহাট মোড়ে যান। এ সময় মুরাদপুর দিক থেকে আসা একটি দ্রুতগতির ট্রাক (নং: চট্ট মেট্রো-ড ১১-২৯৭৬) সন্দেহজনক আচরণ করলে, উপস্থিত কয়েকজন সাংবাদিকের সহায়তায় ট্রাকটি বলিরহাট এলাকা থেকে থামিয়ে চান্দগাঁও থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
উক্ত ঘটনায় উপস্থিত ছিলেন দৈনিক সময়ের কণ্ঠস্বরের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট গাজী গোফরান, চট্টগ্রাম নিউজের রিপোর্টার মোঃ এবাদুল হক এবং দৈনিক ইত্তেফাকের রিপোর্টার নুর নবী শাওন। ট্রাকটি আটকের সময় ট্রাকের কাগজপত্র না দেখে ধারণা করা হয় যে এতে প্রায় ৪০ লাখ টাকার অবৈধ কাঠ রয়েছে।
যাচাইয়ে প্রকৃত তথ্য: পরে গাছের মালিক আলমগীর থানায় উপস্থিত হয়ে ট্রাক ও কাঠের বৈধ কাগজপত্র উপস্থাপন করেন। যাচাই-বাছাইয়ে দেখা যায়, কাঠের বল্লী ছিল ১৩৭টি, যার মূল্য ৩৬,৩৯৯ টাকা এবং কাঠের সানি ছিল ৭০০টি, যার মূল্য ৯১,০০০ টাকা। মোট মূল্য দাঁড়ায় ১,২৭,৩৯৯ টাকা। বিষয়টি যাচাই-বাছাই শেষে ওসি আফতাব উদ্দিন মালামাল বৈধ প্রমাণিত হওয়ায় গাড়ি ও কাঠ মালিকের জিম্মায় সাংবাদিক বন্ধুদের উপস্থিতিতে বুঝিয়ে দেন। অপপ্রচারের সূচনা:
ঘটনার পর পরই কিছু সাংবাদিক ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীর পক্ষ থেকে দাবি ওঠে—ওসি আফতাব উদ্দিন নাকি ৫ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে কাঠসহ ট্রাকটি ছেড়ে দিয়েছেন। অথচ যাদের উপস্থিতিতে এবং যাদের সহায়তায় গাড়িটি জব্দ হয়েছিল, সেই সাংবাদিকরাই পরে থানায় এসে বলেছিলেন যে তাদের কোনো অভিযোগ নেই, এবং মালামালের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ওসি আফতাব উদ্দিনের অবস্থান:
এ প্রসঙ্গে ওসি আফতাব উদ্দিন বলেন,
“আমি একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে থানায় দায়িত্ব পালনে সবসময় সততা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করি। ট্রাকটিতে থাকা কাঠের বৈধতা যাচাই করে, সাংবাদিক বন্ধুদের উপস্থিতিতে এবং তাদের জিম্মায় গাছের মালিক আলমগীরের কাছে গাড়ীটি বুঝিয়ে দিয়েছি। কিন্তু আজ ওইসব সাংবাদিক বন্ধুরাই অপ্রাসঙ্গিক বিতর্ক সৃষ্টি করে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি শুধু আমার ব্যক্তি জীবনে নয়, আমার পরিবার এবং পুলিশের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।” তিনি আরও বলেন,
“যেখানে কাঠের বাজারমূল্য ১ লাখ ২৭ হাজার টাকা, সেখানে ৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ শুধু ভিত্তিহীনই নয়, এটি হাস্যকরও বটে। আমি এই থানায় দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ দমন এবং জনসেবা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে আসছি। ইতোমধ্যে আমি পাঁচবার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ‘সেরা ওসি’ নির্বাচিত হয়েছি, যা আমার পেশাদারিত্বের স্বীকৃতি। হয়তো এই সফলতা কিছু মহলের গাত্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই তারা এ ধরনের অপপ্রচারের আশ্রয় নিচ্ছে।”
সাংবাদিক ও গাছ ব্যবসায়ীদের বক্তব্য: গাছের মালিক আলমগীর বলেন,
“আমার গাড়ী ও কাঠ সম্পূর্ণ বৈধ। কিন্তু যারা প্রথমে গাড়ীটি আটক করেছিলেন, তারা অবৈধ কাঠের কথা বলে ৪০ লাখ টাকার হিসাব তুলে ধরেন। আমি তাদের বলি—যদি আমার কাঠের দাম ৪০ লাখ হয়ে থাকে, তাহলে ২ লাখ টাকায় গাছগুলো নিয়ে যান, বাকি ৩৮ লাখ আপনাদের লাভ। এতে তারা কিছু বলতে পারেননি। ওসি সাহেব আসার পরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় এবং বৈধ কাগজ দেখে গাড়ীটি ছেড়ে দেওয়া হয়।”
শেষ কথা: এই ঘটনা প্রমাণ করে—যে কোন তথ্য যাচাই না করে তা প্রচার করলে তা কেবল একজন সৎ কর্মকর্তার ভাবমূর্তি নয়, বরং গোটা প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা নষ্ট করে দেয়। দায়িত্বশীলতা, পেশাদারিত্ব এবং সততার মানদণ্ডে দাঁড়িয়ে ওসি আফতাব উদ্দিন যেমন প্রশংসার দাবিদার, তেমনি বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার দাবিও এখন সময়ের অন্যতম দাবি।