– মো. কামাল উদ্দিনঃ
আমি ১৯৮৮ সালে ক্রাইম সাংবাদিকতা দিয়ে লেখালেখির যাত্রা শুরু করি। একসময় প্রচুর ক্রাইম রিপোর্ট করেছি, সেখান থেকেই আমার সাংবাদিকতার ভিত্তি গড়ে ওঠে। অপরাধ সাংবাদিকতার ইতিহাস প্রায় গণমাধ্যমের ইতিহাসের সমান দীর্ঘ। সমাজে অপরাধ যখন থেকেই ছিল, তখন থেকেই মানুষের ভেতরে ছিল সেই অপরাধ উদ্ঘাটনের কৌতূহল। তবে সাংবাদিকতার মাধ্যমে অপরাধ অনুসন্ধান ও জনসমক্ষে তা উপস্থাপনের ধারাটি বিশেষভাবে গতি পায় উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে, পাশ্চাত্যে সংবাদপত্রের দ্রুত বিস্তার এবং জনসচেতনতার উত্থানের সময়। বিশ্বব্যাপী ক্রাইম রিপোর্টিংয়ের প্রাথমিক রূপ দেখা যায় যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯০০-এর দশকে আমেরিকায় “মাক্রাকার্স” নামে পরিচিত একদল অনুসন্ধানী সাংবাদিক জন্ম নেন, যাঁরা শিল্পপতি, রাজনীতিক এবং অপরাধ চক্রের সঙ্গে যুক্ত দুর্নীতির খবর জনসমক্ষে আনতে শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে অপরাধ সাংবাদিকতা একটি স্বতন্ত্র ও সাহসিকতাপূর্ণ শাখা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। বিশ্বে যাঁরা এই শাখাকে মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন:সিডনি শ্যানবার্গ (Sydney Schanberg): নিউইয়র্ক টাইমসের এই সাংবাদিক ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং কম্বোডিয়ার গণহত্যা নিয়ে সাহসী প্রতিবেদন করে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি পুলিৎজার পুরস্কারে ভূষিত হন।আনা পলিতকোভস্কায়া (Anna Politkovskaya): রাশিয়ার চেচনিয়া যুদ্ধ এবং পুতিন সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে লেখার জন্য তিনি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হন, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। ডন বোলস (Don Bolles): আমেরিকান অনুসন্ধানী সাংবাদিক যিনি অ্যারিজোনার অপরাধচক্র ও রাজনৈতিক দুর্নীতি নিয়ে কাজ করতেন। ১৯৭৬ সালে একটি গাড়ি বোমায় নিহত হন, যা সাংবাদিকদের নিরাপত্তার ইস্যুতে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে।
রাভি শঙ্কর (Ravi Shankar Etteth): ভারতীয় ক্রাইম রিপোর্টিংয়ের অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। তিনি অপরাধ ও দুর্নীতি নিয়ে নির্ভীক বিশ্লেষণে পরিচিত।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাওয়ার সুবাদে কয়েকজন বিখ্যাত কিংবদন্তি ক্রাইম সাংবাদিকদের সঙ্গে আমার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হয়েছিল বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম, সাহিত্য উৎসব ও সাংবাদিক সম্মেলনে। তাদের প্রত্যেকের ভেতরে আমি দেখেছি এক অভাবনীয় সাহস, অটল সততা এবং সমাজ বদলের অদম্য স্পৃহা। আনা পলিতকোভস্কায়ার সাহসিকতা আমার আত্মাকে নাড়া দিয়েছিল। ডন বোলসের মৃত্যুর কাহিনি শুনে আমি নিজেই অনেকদিন রাত জেগে রিপোর্ট লিখেছি—কারণ, বুঝেছিলাম এ পথে হাঁটতে হলে ভয়কে জয় করতেই হবে।
একবার দক্ষিণ কোরিয়ার এক আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সম্মেলনে আমি অপরাধ সাংবাদিকতা নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছিলাম। সেসময় পাশেই বসা ছিলেন চেক প্রজাতন্ত্রের এক সাংবাদিক, যিনি আন্তর্জাতিক মানব পাচার নিয়ে অনুসন্ধান করছেন। আমরা একসঙ্গে আলোচনা করি, কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হুমকির মুখোমুখি হতে হয়, আবার কীভাবে সমাজকে সত্য জানাতে গিয়ে আমাদের পেছনে ছুটে আসে ক্ষমতাবানদের রোষ।
সাংবাদিকতা যখন সাহসের আরেক নাম হয়ে ওঠে, তখন তা শুধুই লেখা নয়—একটি জীবনদর্শন। অপরাধ সাংবাদিকতা তাই শুধু পেশাগত দায়িত্ব নয়, বরং একধরনের জীবন্ত সংগ্রাম। যারা এই পথ বেছে নেয়, তারা জানে এর পথ কণ্টকাকীর্ণ, তবু সেই পথে হাঁটতে হয় কারণ সমাজের অন্ধকারে আলো জ্বালানোর কেউ না কেউ তো দরকার।
অপরাধ সাংবাদিকতা: সাহস, সততা ও সমাজ বদলের হাতিয়ার- অপরাধ সাংবাদিকতা (Crime Journalism) বিশ্ব গণমাধ্যমের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ও ঝুঁকিপূর্ণ শাখাগুলোর একটি। এটি শুধুমাত্র অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের মাধ্যম নয়, বরং সমাজে অপরাধের প্রকৃতি, কারণ ও প্রভাব বিশ্লেষণের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আমি আন্তর্জাতিকভাবে এই বিষয়ে বিশ্লেষণ করে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব লেখক ও সাংবাদিক সম্মেলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলাম। কারণ, অপরাধ সাংবাদিকতা শুধুই একটি পেশা নয়—এটি এক গভীর সামাজিক দায়িত্ব। সত্য উদ্ঘাটনের পথে একজন সাংবাদিকের প্রয়োজন হয় বহুমাত্রিক চিন্তাশক্তি, গভীর বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং অসীম সাহসিকতা। একজন সাংবাদিক হয়তো রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি কিংবা সাধারণ জনজীবনের খবর প্রকাশ করতে পারেন, কিন্তু সবচেয়ে জটিল ও বিপজ্জনক ক্ষেত্র হলো অপরাধ সাংবাদিকতা। এখানে শুধু তথ্য সংগ্রহ করাই চ্যালেঞ্জ নয়—অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচন, প্রশাসনের গাফিলতি তুলে ধরা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা বিশ্লেষণ এবং ন্যায়বিচারের পথে সমাজকে এগিয়ে নেওয়াও এই সাংবাদিকতার অন্তর্গত কাজ। বিশ্বব্যাপী সংগঠিত অপরাধ চক্র, সন্ত্রাসবাদ, মানবপাচার, সাইবার অপরাধ, অর্থনৈতিক দুর্নীতি, মাদকব্যবসা ইত্যাদি অপরাধ সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান ক্ষেত্র। এসব ভয়ংকর বাস্তবতার গভীরে গিয়ে সত্য উদ্ঘাটনের পথে বহু সাংবাদিক হয়েছেন নির্যাতিত—অনেকে হারিয়েছেন প্রাণও। তবুও তাঁদের থামিয়ে রাখা যায়নি, কারণ তাঁদের কলম সমাজ বদলের এক নির্ভীক হাতিয়ার।
অপরাধ সাংবাদিকতা কেবল অপরাধীর মুখোশ উন্মোচন করে থেমে থাকে না। বরং এটি নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহির আওতায় আনে, প্রশাসনের দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে এবং জনগণকে প্রকৃত তথ্য জানিয়ে সচেতন করে তোলে। এই শাখা তাই সমাজ পরিবর্তনের এক শক্তিশালী বাহন। সাংবাদিকতা যখন পেশার চেয়ে অধিক কিছু হয়ে ওঠে, তখন সত্যই হয় একমাত্র অস্ত্র। আর অপরাধ সাংবাদিকতা সেই যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে প্রতিটি অনুসন্ধান নতুন একটি সত্যের দ্বার উন্মোচন করে। আমার সাংবাদিকতা জীবনের শুরুই হয়েছিল এই ঝুঁকিপূর্ণ অভিযাত্রায়। অন্ধকার জগতের নেপথ্যের কাহিনি অনুসন্ধান করাই ছিল আমার ব্রত। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে আমি নানামাত্রিক অপরাধ নিয়ে লিখে গেছি—হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মাদক চোরাচালান, দুর্নীতি, প্রশাসনিক লুটপাট, এমনকি আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের গোপন তৎপরতা পর্যন্ত।
আমার লেখা শুধু সংবাদপত্রের পাতাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসনের তদন্তে ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে, যেখানে আমার প্রতিবেদন দেখে তদন্ত এগিয়েছে, অপরাধী ধরা পড়েছে, বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তথ্যনির্ভর এবং নির্ভীক সাংবাদিকতার কারণে পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে গড়ে উঠেছিল এক ধরনের পেশাগত আস্থা ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক।
(চলবে)