— মো. কামাল উদ্দিনঃ
সত্য বলার দায় সহজ নয়, বিশেষ করে যখন সত্য কারও গায়ে লাগতে পারে। তবুও বলতেই হয়—এখনকার কিছু তথাকথিত সাংবাদিকের কর্মকাণ্ড দেখে মাঝেমধ্যে না হেসে পারি না। তারা নিজেদেরকে যেন সবজান্তা পণ্ডিত মনে করে, অথচ তাদের লেখালেখির ভাণ্ডারে মৌলিক কোনো কাজের নমুনা নেই। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা তো দূরের কথা, একটা স্বতন্ত্র মতামত কিংবা প্রতিবেদনও তারা কোনো দিন জাতির সামনে তুলে ধরেননি।
তাদের সাংবাদিকতা সীমাবদ্ধ ছিল এক সময়ের প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে—যেখানে না ছিল উপলব্ধি, না ছিল দায়বদ্ধতা। আজ ক্ষমতার পালাবদলে, রাজনৈতিক আশীর্বাদ আর সুযোগসন্ধানী জোটের কারণে তারা কিছু মিডিয়ায় দায়িত্ব পেয়েছেন। দুঃখের বিষয় হলো, প্রকৃত সাংবাদিকদের বাদ দিয়ে, এই অযোগ্যদের কেউ কেউ টেলিভিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় স্থান করে নিচ্ছেন। মালিক পক্ষ, হয়তো মব জাস্টিসের ভয়ে কিংবা সুবিধাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে, যোগ্যজনদের সরিয়ে এদের ওপর ভরসা রাখছেন।
এই নবনিযুক্ত 'মিডিয়া রাজা-মহারাজারা' এখন যেন নিজেদের বিচারক ভেবে নিয়েছে। কে আসল, কে নকল—এই প্রশ্নে তারা ফয়সালা দিতে ব্যস্ত। কথায় কথায় কাউকে "ভুয়া সাংবাদিক" বলে দাগিয়ে দিচ্ছেন। অথচ এদের অনেকেই জানেই না "ভুয়া সাংবাদিকতা" বলতে কী বোঝায়।
এদের এই অহংকারভরা আচরণ দেখে আমার ছোট্ট নাতি কাশিফ হাসে। একদিন বলেই ফেললো—
“দাদা, যাদের নিয়ে আপনি চিন্তিত, তারা কিন্তু আপনার বই পড়ে সাংবাদিকতা শিখে না। অথচ আমি দেখেছি বাতিঘরে আপনার লেখা ‘সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা’ বই হাতে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা পড়ে। আমি নিজেও পড়েছি। আপনার বইয়ে যে সত্যতা আর দায়বদ্ধতা আছে, সেটা যারা পড়ে না, তারা সাংবাদিক হয়ে কীভাবে মানুষের জন্য কিছু করবে?”
কাশিফের সরল অথচ তীক্ষ্ণ কথাগুলো আমাকে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করলো। সাংবাদিকতা নিয়ে সহ আমি যে ৩০টির বেশি বই লিখেছি, তার একাধিক আজ দেশের ও বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স বই হিসেবে তালিকাভুক্ত। আমি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত, টকশো উপস্থাপন করেছি বাংলা টিভিতে তিন বছর, আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সম্মেলনে অংশ নিয়েছি বিশ্বের ২৮টি দেশে, উপস্থাপন করেছি গবেষণা-ভিত্তিক প্রবন্ধ। আজও আমার লেখালেখি ছাপা হয় আন্তর্জাতিক জার্নালে।
এসব বলার উদ্দেশ্য আত্মপ্রচার নয়—আমি বলতে চাই, সাংবাদিকতা কোনো প্রহসনের নাম নয়। এটি একটি মহান দায়িত্ব, যা সত্য, ন্যায়, বস্তুনিষ্ঠতা এবং জনস্বার্থের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। দুঃখ লাগে যখন দেখি, কিছু অজ্ঞ, বেফাঁস মন্তব্যকারী ব্যক্তি এই মহান পেশাকে হেয় করছে, নিজেদের সীমাহীন অযোগ্যতা ঢাকতে গিয়ে প্রকৃত সাংবাদিকদের প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
আমি ভাবছি, আমার সেই ছোট নাতি কাশিফকেই প্রস্তুত করবো সাংবাদিকতার প্রকৃত চেতনা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। কারণ, যারা সাংবাদিকতার সংজ্ঞাই জানে না, তাদের পক্ষে জাতির চেতনার পথপ্রদর্শক হওয়া সম্ভব নয়।
একটা কথা বারবার মনে পড়ে—"খালি কলসই সবচেয়ে বেশি শব্দ করে"। আর শব্দ করলেই তো জ্ঞানী হওয়া যায় না, দায়িত্বশীল হওয়া যায় না।
আসুন, আমরা যারা সত্যিকারের সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করি, তারা এই প্রহসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াই। শিক্ষিত হই, অন্যদেরও শিক্ষিত করি—যাতে সাংবাদিকতা তার হারানো মর্যাদা ফিরে পায়।