মো.,কামাল উদ্দিনঃ
আমি বহুদিন ধরেই ভাবছি, জীবনের দীর্ঘ সাহিত্য সাধনা, রচনা, গবেষণা আর বই সংগ্রহের একটি অমূল্য ভাণ্ডার গড়ে তোলা হয়েছে আমার। এই ভাণ্ডার শুধু আমার নয়, এটি আমার জাতির, আমার সংস্কৃতির এবং বিশেষত আমার প্রিয় শহর চট্টগ্রামের এক অমুল্য সম্পদ। কিন্তু সেই ভাণ্ডারকে রক্ষা করবেন কে? আমার লেখা, আমার সংগ্রহ, আমার কলমের মাধুর্য কি হারিয়ে যাবে দিনের শেষে? এসব প্রশ্নে মুছে মুছে যেতে বসেছিল আমার আত্মবিশ্বাস।
কিন্তু আজ, বাতিঘর লাইব্রেরির সেই বিশাল পাণ্ডুলিপির ভেতর থেকে আমার লেখা বই খুঁজে বের করে পড়তে শুরু করেছে আমার ছোট নাতি কাশিফ—সে ছোট বালক নয়, সে আমার সাহিত্যের এক দীপ্তিময় আলোর কণিকা। আমি তাকে দেখছি আজ, গর্বিত হৃদয়ে, সে যেন হয়ে উঠেছে আমার লেখালেখির জীবন্ত ধারক।
বাতিঘর লাইব্রেরি, চট্টগ্রামের বৃহত্তর এক বিশাল গ্রন্থ ভাণ্ডার, যেখানে পাণ্ডিত্য আর জ্ঞানের সমাহার। প্রতিদিন এই বাতিঘরে শতশত মানুষ এসে বই পড়ে, বই কিনে, জ্ঞানার্জনে বিভোর হয়। কিন্তু আমার জন্য এর মানে আলাদা—কারণ আমার লেখা বই সেখানে পড়ে, এবং তা পড়ছে আমার নিজের নাতি।
কাশিফের চোখে বইয়ের প্রতি সেই গভীর ভালোবাসা, আগ্রহ এবং অনুসন্ধিৎসা আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। সে শুধু বই পড়ছে না, নিজেকে পরিণত করছে। সে জানে, বই শুধু কাগজের স্তর নয়, বই হলো চিন্তার প্রজ্বলক, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সে তার আচার-আচরণ, কথাবার্তা ও ভাবনায় এমন এক মাধুর্য এনে দিয়েছে যা আমার মনে প্রগাঢ় আশা জাগায়—সে বড় হয়েই হয়তো আমার থেকে অনেক দূর এগিয়ে যাবে, আমার লেখার আলোকে বহন করবে তার নিজের ভিন্ন মঞ্চে।
গতকাল ও আজ, আমি তার সঙ্গে বাতিঘর থেকে শুরু করে শহরের বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি। যেখানে যেখানে গেছি, কাশিফ যেন নিজের পায়ের উপর নির্ভরশীল, চিন্তাশীল আর দায়িত্বশীল এক তরুণের মতো আচরণ করছে। তার ভাষার সরলতা, তাঁর চিন্তার গভীরতা আমাকে বিমোহিত করেছে। বই কেনার জন্য তার উন্মাদনা দেখে আমার মন ভরে উঠেছে আনন্দে—আজকের দিনে সে ১২৭১ টাকার বই কিনেছে, যা তার পড়াশোনার প্রতি এক গভীর নেশার প্রকাশ।
আমি মনে মনে ভাবি, কী আনন্দ যে আমার রক্তের সুরির ধারক কাশিফ বইয়ের প্রতি এমন উৎসাহী। বাতিঘর লাইব্রেরির নির্জন কোণে দাঁড়িয়ে সে যেন এক দীপ্তিমান ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখে। আর আমি, তার দাদা হিসেবে, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন সে এই আলোকিত পথেই থেকে যায় সারাজীবন।
কাশিফ নিজেকে পরিচয় দেয় বড় সাংবাদিক হিসেবে। আমার প্রতি তার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ পায় সে যখন বলে, “আমার দাদা কি সাংবাদিক!” তার সেই স্বতঃস্ফূর্ত প্রশ্ন আমাকে হালকা করে হাসায়, আবার মনে করিয়ে দেয় আমার দায়িত্বের গভীরতা। এই তরুণটি হয়তো একদিন দেশকে নতুন আলোর পথে নিয়ে যাবে—সেই বিশ্বাস আমার মনকে সান্ত্বনা দেয়।
আমার লেখালেখির জীবনের যাত্রা দীর্ঘ। গবেষণার জন্য শত শত রাত জেগে, বহু বই পড়েছি, লিখেছি সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের নানা দিক নিয়ে। এই সংগ্রাম যেন আজ কাশিফের চোখে প্রাণ পেয়েছে। বাতিঘর লাইব্রেরির অগণিত বইয়ের মাঝে আমার লেখা বই খুঁজে পাওয়া, তা পড়ে সেই ভাবনায় ডুবে থাকা—সবকিছু যেন একটি নতুন জীবনের সূচনা।
আমি মনে করি, আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি বাঁচানোর একমাত্র উপায় হলো এই প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার প্রতি ভালোবাসা ও সচেতনতা সৃষ্টি করা। কাশিফ সেই ধারাকে বহন করছে, তার মাধ্যমে আমার লেখা বইয়ের মর্মবাণী জীবিত থাকবে, সাহিত্যের আলো আঁধার কাটিয়ে এগিয়ে যাবে।
বাতিঘর লাইব্রেরি শুধু বইয়ের দোকান নয়, এটি হলো জ্ঞানের মন্দির, যেখানে প্রতিটি পাতা থেকে জ্বলে উঠছে নতুন চিন্তার আলোকরশ্মি। আজ আমার নাতি কাশিফ সেই আলোকরশ্মি হয়ে উঠেছে। তার এই প্রগাঢ় আগ্রহ আমাকে অনুপ্রাণিত করে, ভবিষ্যতের প্রতি বিশ্বাসের প্রদীপ জ্বালায়।
আমার কাছে কাশিফ শুধু নাতি নয়, সে আমার লেখালেখির জীবন্ত উত্তরাধিকার। তার মধ্যে আমি দেখি আগামী দিনের লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক। সেই কাশিফ যে বইয়ের প্রতি পাগল হয়ে ওঠে, যার চোখে বই পড়ার আনন্দ ফুটে ওঠে—সে একদিন আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির পথপ্রদর্শক হবে এইটাই আমার বিশ্বাস।
শেষে আমি শুধু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, এই কাশিফ যেন সাহিত্যের আলোকে হারিয়ে না ফেলে, যেন সে চিরকাল নিজের মধ্যে এই সাহিত্যিক স্পৃহা ধরে রাখে। যেন তার কলম আমাদের সংস্কৃতির গৌরবের কাহিনী আরো উজ্জ্বল করে, আর সে নিজেও হয়ে ওঠে আলোর পথের পথিক—যিনি সাহিত্যের অমলিন দীপ্তি বহন করবেন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।