মোহাম্মদ ইব্রাহিমঃ
বছর ঘুরে আবার এসেছে কোরবানির ঈদ। শহরের গলি থেকে মহল্লা, মাঠ থেকে বাজার—সবখানেই এখন গরুর গমগম শব্দ। কেউ কিনছে শাহীওয়াল, কেউ নিলামে হাত তুলছে দেশি লাল, কেউ আবার গোরুর পেছনে কোরবানির চেয়েও বড় ঋণ নিয়ে বাড়ি ফিরছে। এই সময়টাতেই সমাজের আরেক শ্রেণির মানুষ ঘুম থেকে জেগে ওঠে। এরা সারাবছর ‘শান্ত নিরীহ’ থাকলেও ঈদ এলে হয়ে যায় ‘চৌকস কর্মব্যস্ত’। এরা হলো—গরু চোর। আর এদের মধ্যেও এক কিংবদন্তির নাম ওয়াসীম!
ওয়াসীম কোনো সাধারণ চোর নয়। সে ঈদের মৌসুমি গরু-উদ্যোক্তা! তার গরু চুরির ইতিহাস মহল্লার দেয়ালে দেয়ালে লিখে রাখলে, ছেলেমেয়েরা ইতিহাস বই ফেলে সেই দেয়াল পড়ে পরীক্ষায় সেঞ্চুরি করত।
ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকে ওয়াসীমের মধ্যে একটা পরিবর্তন দেখা যায়। মুখে হালকা দাঁড়ি, গায়ে পাঞ্জাবি, হাতে তসবিহ—লোকজন ভাবে, বুঝি এইবার তওবা করে ফেরেশতা হয়েছে। আসলে সে তওবা নয়, তল্লাশিতে নেমেছে। কার বাড়িতে কয়টা গরু, কোনটা মোটাতাজা, কার বাড়ির সিসিটিভি নকল আর কারটা আসল—সব হিসেব তার নখদর্পণে।
গত বছর এক ব্যবসায়ী এক লক্ষ চল্লিশ হাজার টাকায় একটা গরু কিনে এনে বলেছিলেন, "এইবার আর কেউ ঠকাইতে পারবে না!" কিন্তু সেই রাতেই গরুর দড়ি খুলে ওয়াসীম এমনভাবে নিয়ে গেল, যেন গরুটা তারই শ্বশুরবাড়ি থেকে পাঠানো উপহার! পরদিন সকালে ব্যবসায়ী দেখলেন খুঁটি আছে, দড়িও আছে—শুধু গরুটা নেই। তিনি চিৎকার করে বললেন, “আল্লাহ! এই খুঁটি গরু খায় নি তো?” পাশের বাড়ির ফজলু ভাই ফিসফিস করে বললেন, “ভাই, ওয়াসীমের এলাকায় গরু বাঁধলে এমনই হয়...”
ওয়াসীমের কৌশল এত নিখুঁত যে, কেউ বুঝতেই পারে না সে চুরি করছে নাকি গরুর সঙ্গে প্রেম করছে! সে এমনভাবেই গরুর গলা আদর করে দড়ি খুলে যে, গরুটা ভাবেও না তার মালিক বদলে গেছে। সে নাকি গরুর চোখের ভাষা বুঝে—কারণ প্রেমিক আর চোর, দুজনেই চেয়ে থাকে গভীর ভালোবাসায়!
এখন লোকজন গরু কিনলে আগে দড়ি না, কিনে ক্যামেরা। কেউ কেউ তো গরুর গলায় ছোটদের ব্যবহৃত GPS ট্র্যাকার বেঁধে রাখছে। অথচ ওয়াসীমের মত চোরদের কাছে এইসব আধুনিক প্রযুক্তি মানে একরকম খেলা। সিসিটিভি থাকলে সে হেলমেট পরে, ট্র্যাকার থাকলে গরুর কান টিপে টিপে খুলে নেয়। সে যেন গরু চুরি করে না, গরুর মুক্তির অভিযান চালায়!
একবার এক বৃদ্ধ গরু কিনে বললেন, “এইবার আর কেউ নিতে পারবে না, আমি নিজের চোখে পাহারা দেব।” তিনি সত্যিই পাহারা দিলেন—রাতভর গরুর পাশে বসে থেকে শুধু ঘুমালেন একবার, মাত্র পাঁচ মিনিট। ভোরে উঠে দেখেন, গরুর বদলে বাঁধা আছে একটি চিরকুট—
"চাচা, ঘুমাও, গরু এখন আমার সাথে নামাজে গেছে। — ওয়াসীম"
এটাই আজকের বাস্তবতা। গরু চোরদের কাছে ঈদ মানে শুধু কোরবানি নয়—এ যেন তাদের 'বার্ষিক বোনাস সিজন'! ওয়াসীমরা সমাজের সেই ছায়ামূর্তি, যাদের হাতে গরুর দড়ি মানেই আপনি দুধ-ঘি নয়, বরং চোখের জল পাবেন।
শেষ কথা:
এবার ঈদে শুধু গরু কেনা নয়, গরু রক্ষা করাও একটি মহৎ কাজ। ওয়াসীমদের শিকল পরাতে না পারলে, গরুর দড়ি আর কোরবানির খুঁটি কোনো কাজে আসবে না।
সুতরাং, গরুর দিকে নয়, চোরের চোখে নজর দিন!
ঈদ হোক নিরাপদ, গরু থাকুক খুঁটিতে—ওয়াসীম নয়!