রাইসা আকতারঃ
কোরবানির ঈদ এলেই আমাদের সমাজে এক বিশেষ শ্রেণির মানুষ জেগে ওঠে। এদের পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় না, কিন্তু গরুর নাকে দড়ি পড়তে না পড়তেই এরা গরুর পেছনে দড়ি নিয়ে পড়ে। এরা হলো—গরু চোর। আর এ চোরদের মধ্যেও এক কিংবদন্তির নাম হলো ওয়াসীম। কোরবানির ঈদের ঠিক সাতদিন আগে থেকেই সে এলাকাজুড়ে ছায়ার মতো ঘোরে। লোকজন ভাবে, সে হয়তো ধর্মীয় অনুভূতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ‘নামাজের প্রতি মনোযোগী’ হয়ে উঠেছে। আসলে সে মনোযোগী হয়েছে ‘কার গরু কোন খুঁটির সঙ্গে বাঁধা’, সেই জরিপে।
ওয়াসীমের গরু চুরির কৌশল এতটাই উন্নত, মনে হয় সে কোনো আন্তর্জাতিক গরু গবেষণা কেন্দ্র থেকে পিএইচডি করে এসেছে। সে জানে কোন গরু "শাহীওয়াল" আর কোনটা "লোকাল", কোন গরুর মালিক দরিদ্র কিন্তু গরুটা মোটাসোটা—অর্থাৎ সহজ টার্গেট। সে বুঝে নেয় কোন বাড়ির সিসিটিভি নকল আর কোন বাড়ির দরজার তালা শুধুই লোক দেখানো।
এক বছর এক ভদ্রলোক ঈদের দুইদিন আগে গরু কিনে এনে খুব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন—“এইবার একটু আরাম করমু, গরু তো হইল।” কিন্তু ঠিক সেই রাতে ওয়াসীম এসে সেই গরুর নাকে আদর করে দড়ি খুলে নিয়ে গেল, এমনভাবে যে গরুটাও বুঝতে পারেনি সে মালিক বদলেছে। পরদিন সকালে ভদ্রলোক যখন গরুর স্থানে শূন্য জায়গা দেখে চিৎকার শুরু করলেন, তখন পাশের বাড়ির মানুষ এসে শুধু বলল, “ওয়াসীমের এলাকায় গরু বাঁধলে কান্দতে হয় ভাই!”
এলাকার মানুষ এখন গরু কিনলে আগে সিসিটিভি লাগায়, তারপর গরু বাঁধে। কেউ কেউ আবার গরুর গলায় বাচ্চাদের ব্যবহৃত GPS ট্র্যাকার বেঁধে রাখে। কিন্তু তাও ঠেকাতে পারে না ওয়াসীমের মেধাবী আক্রমণ। কারণ সে শুধু চোর না, সে এক ঈদ-নির্ভর উদ্যোক্তা! তাকে ঈদের মৌসুমি ব্যবসায়ী বলা যায়।
আশ্চর্য ব্যাপার হলো, বছরের বাকি সময় ওয়াসীম সম্পূর্ণ নিরীহ! কারো গাছের আমও ছিঁড়ে না। সে এমনকি মসজিদে আজান শুনলে টুপি পরে দৌড়ে চলে যায়। কিন্তু ঈদের সময় সে যেন এক নতুন রূপ ধারণ করে। কে বলবে সে ‘পবিত্র ঈদুল আজহার’ মাহাত্ম্যে বিশ্বাসী! বরং মনে হয় সে ‘ঈদের গরু পুনঃবন্টন কমিশন’-এর চেয়ারম্যান!
এবার ঈদেও মানুষ আতঙ্কে। যারা গরু কিনেছেন তারা গরুর জন্য পাহারাদার ভাড়া করছেন, অনেকে আবার রাত জেগে গরু পাহারা দিচ্ছেন। এক বৃদ্ধ তো গরুর পাশে খাট পেতে শুয়ে গেছেন, যেন নিজের উপস্থিতিই গরুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। আর ওয়াসীম? সে হয়তো এখনই কোনও গাছের ছায়ায় বসে চা খাচ্ছে, আর আপন খেয়ালে বলছে, “গরু থাকলে ভয় কী? ওয়াসীম তো জাগ্রত!”
শেষ কথা:
এই কোরবানির ঈদে বলি শুধু পশু নয়, বলি হোক চোরের মানসিকতারও। ওয়াসীমদের সমাজ থেকে চিরবিদায় দিতে হবে—তবেই ঈদের প্রকৃত আনন্দ ফিরে আসবে। গরু নয়, এবার নজর দিন চোরের চোখে!